২২
- জানুয়ারী
২০১৭
লিখেছেন : ওয়েব ম্যানেজার
বাংলা কম্পিউটিং; একটি স্বপ্নযাত্রার প্রারম্ভিকা

উদ্ভাবনের উম্মাদনায় নতুনত্বের খোঁজে নিরন্তর ছুটে চলে সৃষ্টিশীল মানুষ। প্রতি নিয়ত তাদের হাত ধরে উন্নতির পথে চলছে সভ্যতার অগ্রযাত্রা। একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান পৃথিবী এখন প্রযুক্তিনির্ভর। ফাইবার অপটিক, থ্রিজি কিংবা এর চেয়ে কোন উন্নততর অন্তর্জাল বিশ্বকে পরিনত করছে গ্লোবাল ভিলেজে। অজপাড়া গাঁয়ের স্বাপ্নিক কিশোরটি পিসির সামনে বসে ঘুরে বেড়াচ্ছে হিল্লি-দিল্লি, লন্ডন কিংবা আমেরিকা। ভার্চুয়াল জগত আর ত্রিমাত্রিক স্ক্রীনে হাজির হচ্ছে প্রতি মুহুর্তের মহাবিশ্ব। এই শতকের ঈর্ষনীয় সাফল্যের অন্যতম কারিগর কিংবা পাইওনীয়ার হচ্ছে প্রযুক্তি। এটা একটি অনস্বীকার্য এবং সুপ্রমানিত সত্য।

আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বাত্মক উন্নয়নে প্রযুক্তির সুফল সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌছাতে হবে। সাধারণ মানুষকে প্রযুক্তির প্রয়োগে সম্পৃক্ত করতে হবে। আর সেটা বাস্তবায়ন করতে হলে মাতৃভাষা নির্ভর প্রযুক্তিশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইদানিংকালে এ নিয়ে স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু হয়েছে। একে বাংলা কম্পিউটিং বলা হচ্ছে। প্রযুক্তির প্রয়োগ ক্ষেত্রে বাংলাকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করাই বাংলা কম্পিউটিং। বাংলা কম্পিউটিংকে একটি গ্রহনযোগ্য পর্যায়ে তুলে আনার জন্য এর পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা আবশ্যক। উল্লেখযোগ্য না হলেও বলা যায়, বাংলা কম্পিউটিংয়ে আমরা বেশ এগিয়েছি। বিচ্ছিন্ন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। অতি ক্ষুদ্র এসব কার্যক্রম প্রশংসার দাবী রাখে। বাংলা কম্পিউটিংয়ে আমরা বর্তমানে কোন অবস্থানে আছি, তার একটি ছোট্ট চিত্র চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস পাব।

বাংলা কম্পিউটিংয়ে সর্বপ্রথম সফলজনক পদক্ষেপ ছিলো বাংলা লেখার সফটওয়্যার আবিস্কার। আবিস্কৃত হয় শহীদলিপি। মোস্তফা জব্বার তৈরী করেন বিজয়। সেদিন থেকেই আমাদের প্রযুক্তিক্ষেত্রে নতুন যুগের উদ্বোধন হয়। টাইপ রাইটারের খাঁজকাটা ডাইস ছেড়ে আমাদের প্রিয় অক্ষরগুলো হেঁটে বেড়াতে শেখে ডিজিটাল ফরম্যাটে। অভ্র নামের আরেকটি ওপেনসোর্স সফটওয়্যার, বর্তমানে বাংলা কম্পিউটিংয়ে নতুন এক বিপ্লব তৈরী করছে।

বাংলা ডিজিটাল বইয়ের ধারনা আজ বাস্তব পরিনত। বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য অংশ বাংলাসাহিত্য। চর্যাপদ থেকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের রত্নভান্ডার সংরক্ষনে আনন্দ চলন্তিকা লিমিটেড এসকল চিরায়ত সাহিত্যকর্মকে ডিজিটাল ফর্মে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। প্রকাশিত হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য আর জীবনানন্দ দাশের সমগ্র রচনাবলী। শীঘ্রই প্রকাশিত হবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন, উপেন্দ্র কিশোর রায়, ময়মনসিংহ গীতিকা, মীর মশাররফ সহ আরো অনেক রচনা সংকলন। আমাদের সাহিত্যের জন্য এটা একটি সুসংবাদ নিঃসন্দেহে।

কিছুদিন আগেও সমৃদ্ধ বাংলা ওয়েবপোর্টাল ছিলো হাতেগোনা। অপারেটিং সিষ্টেমের সীমাবদ্ধতা, ফন্টের সমস্যা, ইউনিকোড নিয়ে জটিলতা ইত্যাদি কারনে বাংলা ভাষায় ওয়েবসাইট তৈরী করা ছিলো পরিশ্রমসাধ্য। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। ধীরে হলেও বাড়ছে বাংলাওয়েবের সংখ্যা। ইউনিকোড জটিলতার সমাধান করা হচ্ছে। এবং লিন্যাক্স সার্ভার ও ইউনিকোড এর কল্যানে এখন বাংলা ওয়েবসাইট তৈরীর কাজও অনেক সহজ হয়ে গেছে। জনপ্রিয় হচ্ছে বাংলা ব্লগিং। সামাজিক সচেতনতা তৈরীতে এসব ব্লগের কর্মতৎপরতা বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।

বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ বাংলা উইকিপিডিয়া। এখানে রয়েছে প্রায় একুশ হাজার নিবন্ধ। একুশ হাজার আলাদা আলাদা বিষয়ে এখানে পাওয়া যাবে বিস্তারিত তথ্য। রয়েছে প্রায় ৬০ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী। এই প্রকল্পের উন্নয়নে কোন ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করছেন অসংখ্য কর্মী। বাংলা ভাষার সর্ববৃহৎ তথ্য আধেয় উইকি বাংলার এই বিপুল পরিমান তথ্য সুচারুভাবে ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয়েছে ওপেনসোর্স ডাটাবেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম মাইএসকিউএল ব্যবহারে ফলে। এই সিষ্টেমে যে কোনো ধরনের তথ্য সংযোজন, পরিমার্জন বা অনুসন্ধানের কাজ করা যায় সম্পূর্ণ বাংলায়।

মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম লিন্যাঙ্রে প্রায় ডিষ্ট্রিবিউশন পুরোপুরি বাংলায় ব্যবহার করা যায়। উবুন্টুতে বাংলা ইন্টারফেসে কাজ করার চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। উবুন্টু, ফেডোরা, সুসি, লিন্যাক্সমিন্টের মত জনপ্রিয় লিন্যাক্স সিস্টেমে সব মেনু ফাইল ফোল্ডারের নাম বাংলায় ব্যবহার করা যাবে। সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য তৈরী করা কম্পিউটার প্রকল্প ‘ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড’। এই কম্পিউটারে যে অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে তার মূলে রয়েছে মুক্ত কার্নেল লিন্যাক্স। সুগার ওএস নামের এই নামের এই অপারেটিং সিস্টেমও সম্পূর্ণ বাংলায় স্থানীয়করন করা হয়েছে। অপারেটিং সিস্টেম ছাড়াও নিত্যব্যবহার্য কাজের উপযোগী সফটওয়্যারও এখন পাওয়া যাচ্ছে বাংলায়। যেমন- ওয়ার্ড প্রসেসিং, সপ্রেডশিট, ও প্রেজেন্টেশন তৈরীর জন্য অফিস সু্যট হলো ওপেন অফিস ডট অর্গ। ওয়েব ব্রাউজার মজিলা ফায়ারফক্স, ই-মেইলিং সফটওয়্যার থান্ডারবার্ড, ইন্সট্যান্ট ম্যাসেঞ্জার পিজিন মিডিয়া প্লেয়ার ভিএলসি ইত্যাদির বাংলা স্থানীয়করন হয়েছে। এসব সফটওয়্যারগুলো ইউনিকোড নামের আন্তর্জাতিক অক্ষরবিন্যাস পদ্ধতি ব্যবহার করার কারনে খুব সহজেই এগুলোকে বাংলায় ব্যবহার করা যাচ্ছে। বর্তমানে জনপ্রিয় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ‘জুমলা” ব্যবহার করা যায় পুরোপুরি বাংলায়। আছে শক্তিশালী আরেক সিএমএস ওয়ার্ডপ্রেস। মুক্ত ব্লগিং প্লাটফর্ম ওয়ার্ডপ্রেসেও বাংলা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানান ধরনের বাংলা বেইজড সফটওয়্যার তৈরীর চেষ্টা চলছে। মুক্ত কন্টেন্ট লেখা, মুক্ত সফটওয়্যার তৈরী, বাংলায় স্থানীয়করনে অনেক নিবেদিত প্রান প্রযুক্তি-কর্মীরা ব্যক্তিগত এবং দলগত ভাবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাভাষায় ওপেনসোর্সের উদ্ভাবন এবং সমন্বয়ের কাজ করছে বেশ কিছু সহকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে বাংলাদেশ ওপেনসোর্স সেটওয়ার্ক বা বিডিওএসএন। এর পাশাপাশি একুশে, ওমিক্রন ল্যাব অঙ্কুর ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানও বাংলা বেইজড কম্পিউটিং ডেভেলপমেন্টের কাজ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় কোন প্রতিষ্ঠান তৈরী করেছে থান্ডারবার্ড, ফায়ারফক্স, সিমাঙ্কির জন্য বাংলা বানান শুদ্ধিকরন সফটওয়্যার (বাংলা অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন)। কেউ আবার তৈরী করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের তৈরী সাহানা হৈমন্তি, ইত্যাদি বাংলা বেইজড সফটওয়্যারগুলোর কোন কোনটা ই-লোকালাইজেশন ক্যাটাগরিতে পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। প্রকাশিত হয়েছে অটোমেটেড বাংলা ট্রান্সলেশন সফটওয়্যার।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিদের জন্য তৈরী হয়েছে বাংলা টেক্স টু স্পিচ, স্ক্রিন রিডার, ওসিআর সহ বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ্লিকেশন। সমৃদ্ধ হচ্ছে ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পরিভাষা কোষ, বাংলা ওয়ার্ডনেট বা শব্দজালিকা, বাংলা উচ্চারন অভিধান ইত্যাদি সফটওয়্যার। বাংলা কম্পিউটিংয়ে প্রত্যাশিত গতি এবং ব্যাপকতার অভাব সত্বেও আমরা যে ধীরে সামনেই পা ফেলছি এটা নিশ্চয় করে বলা চলে।

বাংলা বেইজড ডিজিটাল টেকনোলজির আশানুরূপ উন্নয়ন এবং এর ব্যাপক ভিত্তিক সমপ্রসারণে সরকার ও উদ্যোগী ব্যাক্তি এবং সংস্থাগুলোকে অনতিবিলম্বে এগিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তিক্ষেত্রে সময়োপযোগী সঠিক পদক্ষেপ আইটি সেক্টরে আমাদের গতি দ্রুত তরান্বিত করবে। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়, যেদিন আগামী প্রজন্মের ছোট্ট শিশুটির ”বাংলায় করা চিৎকার” বাংলা বেইজড টেকনোলজি সিস্টেমের যান্ত্রিক ডানায় ভর করে ছড়িয়ে পরবে সারা পৃথিবীতে। আমি বিশ্বাস করি, আমরা আমাদের সোনার বাংলা গড়ার রঙিন স্বপ্নটাকে ছুঁয়ে দিতে পারব। এ স্বপ্নটা নিশ্চয়ই ৭১রের বিজয়ের স্বপ্নের চেয়ে বড় কিছু নয়?

===========
বিঃদ্রঃ :- এই পোস্টটি লেখা হয়েছিলো ২০১৩ সালে। এক স্থানীয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো। তাই, সেই ভাবেই লেখাটি দিয়ে দিলাম। তথ্যের আপডেট করলাম না ইচ্ছে করেই।

মন্তব্য করুন